রাধা শীতল সমুদ্রে এ বসন্তে খুশি থাকবে তো!

বড়ু চণ্ডীদাসের শ্রীকৃষ্ণকীর্তন অবলম্বনে রাধাকৃষ্ণ এর রসরঙ্গের এই কাহিনি…….

গ্রামের ধারে বন, বনের ভেতর নদী। বন ডিঙিয়ে নদী পেরিয়ে হাট। সে হাটে নানা পসরার বিকিকিনি। হাটটি গাছে গাছে ঘেরা, নদীর হাওয়া লাগে গাছের পাতায়। পুরনো পাতা ঝরে পড়ে, দুধ-দই-ক্ষীরের পসরায়। গ্রাম থেকে দল বেঁধে এসেছে মেয়ের দল। বাঁকগুলি নামিয়ে রেখেছে বড় গাছটির তলায়। বাঁকে বাঁকে নানা মাপের কলস। কলসের মুখ শ্বেত-আবরণে ঢাকা। মেয়েদের চিত্র-বিচিত্র বস্ত্রে পড়েছে সকালবেলার আলো। প্রতিফলিত আভায় দই-দুধ-ক্ষীরের কলসের শ্বেত-আবরণীগুলি কেমন রঙিন হয়ে উঠল, আবরণীর ওপরে পাতাটিকে দেখে মনে হয় কেউ বুঝি তাকে ঝরে পড়ার পর রং মাখিয়েছে।

মেয়েরা নিজেদের মধ্যে কথা বলছে, হাসছে, এ-ওর গায়ে ঢলে পড়ছে। হাটে আসার জন্য তারা মুখিয়ে থাকে। এমনিতে খুব একটা ঘরের বাইরে যাওয়ার উপায় তাদের নেই। পুরুষেরা গোচারণে যায়, শস্যক্ষেত্রেও, গ্রামের গাছতলাগুলিতে গোল হয়ে বসে যত ক্ষণ খুশি বাক্‌ বিনিময় করে তারা। মেয়েদের বাইরে যাওয়া বলতে তো কেবল জল আনতে বা নদীতে স্নান করতে যাওয়া। সে আর কতটুকু পথ। হাটে যাওয়ার সময় বনের ভেতর দিয়ে অনেকটা যেতে হয়। সেই তাদের স্বাধীন চলাচল। পায়ে চলার পথ ঝরা পাতায় ঢেকে থাকে, ঝরা পাতায় শব্দ তুলে বসন্ত বাতাসের মতো হাসতে হাসতে কথা বলতে বলতে চলে কিছু ক্ষণের জন্য স্বাধীন মেয়েরা। সেই চলার গতিতে ছন্দ আছে, মাথায় কিংবা বাঁকে যে সামগ্রী থাকে তা কখনও তাদের চলায় বেসামাল হয় না, চলকে পড়ে না।
মেয়েদের দলে আজ এক জন বড় আনমনা। বেচা-কেনায় তার মন নেই। মেয়েদের দলের থেকে একটু দূরে দাঁড়িয়ে এক খুনখুনে বুড়ি। তার গাল ভাঙা, চোখ গিয়েছে ঢুকে, ঠোঁট পড়েছে ঝুলে, মাথায় যে ক’টা চুল আছে তা শনের মতো সাদা। মেয়েদের চলার সঙ্গে বুড়ি কিছুতেই তাল মেলাতে পারে না। পিছিয়ে পড়ে, পথ হারায়, মাঝে মাঝে থামে। পথশ্রমে কাশে আর হ্যা হ্যা করে হাঁপায়। তবু এই বুড়িকেই মেয়েটির শাশুড়ি বড় ভরসা করে তার বউমার ওপর নজর রাখার জন্য নিয়োগ করেছে। সব স্বাভাবিক হলে নিয়োগ করতে হত না, তবে সবার কপাল তো আর সমান হয় না। ছেলে তার এমনিতে সুপুরুষ— তবে কোনও কোনও পুরুষ থাকে যাদের বাইরের সেই আকার বরফের মতো শীতল। তাদের শরীরের পাতা ঝরে না, সেই ঝরা পাতায় এসে পড়ে না সকালবেলার রঙিন আলো, সেই আলো লেগে জেগে ওঠে না নতুন পাতার গান। এমন শীতল ছেলেকে বড় ভালবাসেন মা, কিন্তু ছটফটে মেয়েটি, যাকে বউ করে ঘরে তোলা হল, সে এই অজাগর শীতল সমুদ্রে এ বসন্তে খুশি থাকবে তো! মেনে নেবে স্বামীর নপুংসকতা? দেহতরী বাইবে না তো অন্য কোনও ঘাটে?
তা আটকানোর জন্যই তো বড়াই বুড়ি সঙ্গে থাকে রাধার। তবু কী রং আটকানো যায়!
রাধা নামের আনমনা মেয়েটি গাছতলা থেকে বাইরে এসে যে নদী আর বন সে পিছনে ফেলে এসেছে সেই দিকে তাকিয়ে থাকে ।
বড়াই সে দিন তাদের সঙ্গে যথারীতি তাল রাখতে পারেনি। বনের পায়ে-চলা পথগুলি বড় এক রকম, দেখার চোখ না থাকলে তাদের আলাদা করা যায় না। বড়াই আলাদা করতে পারেনি। রাধা আর তার দলবলকে হারিয়ে সে এ পথ সে পথ করতে করতে শেষে প্রায় হাল ছেড়ে দিয়েছে, কাঁদো কাঁদো অবস্থা। বন থেকে কী ভাবে গ্রামে ফিরবে তারই ঠিক নেই। এমন সময় কানে এল বাঁশির শব্দ। মিঠে তান। গরুও দেখা যাচ্ছে কয়েকটা। রাখাল ছেলেটা একেবারে অচেনা নয়। ফোকলা দাঁতে ঝুলে পড়া ঠোঁটে হাসি ঝুলিয়ে বড়াই বলে, ‘নাতি, আমার নাতনিকে দেখেছ?’ ছেলেটা বাঁশিতে ঠোঁট রেখে চোখ তোলে, বড়াইকে দেখে, ফের চোখ নামিয়ে বাঁশিতে ফুঁ দেয়। ঢং দেখে রাগে বড়াইয়ের অঙ্গ জ্বলে। তবু আর এক বার ফোকলা দাঁত আর উটের মতো ঝুলে পড়া ঠোঁট তুলে কাতর স্বরে বলে, ‘বাবা আমার, নাতনিকে দেখেছ?’ এ বার বাঁশি থামিয়ে ছেলে বলে, ‘কে তোমার নাতনি?’ নাম-ধাম-বরের নাম এ সব কিছু না জানিয়ে বলে ওঠে বড়াই, ‘ওগো তার চুলে জামরঙের মেঘ, চোখে হরিণীর চঞ্চল চোখের ছায়া’। বড়াই একটা করে তুলনা দেয় আর ছেলে তার তালে তালে এক বার করে বাঁশিতে দেয় ফুঁ। যেন পথ হারায়নি বুড়ি, যেন মনে তার রঙ্গ হয়েছে বড়, যেন নিপুণ সখীর মতো নাতনি রাধার দিকে সে টেনে আনতে চাইছে এই বাঁশিওয়ালাকে। যেন বলতে চাইছে, ‘যার কাছে যে সাজে।’ যেন বলতে চাইছে, ‘এ রূপ অরসিকের লাগে না কোনও কাজে।’ আর বাঁশিওয়ালা যে রঙিন মানুষ সে তো বোঝাই যাচ্ছে— না হলে কথা নেই বার্তা নেই এক একটা রূপময় তুলনার সঙ্গে সে বাঁশিতে ফুঁ দেয়! বাঁশির তানে তানে সে রূপকে সে ছড়িয়ে দিচ্ছে বনে বনে।
বনের ধারে নদী। কোথাও কুলু-কুলু, কোথাও খরস্রোতা। এ নদীর যে জাত চেনে না তার বিপদ অনিবার্য। জল অল্প ভেবে কেউ হয়তো পা রেখেছে নদীতে, অমনি হঠাৎ চোরাস্রোতে তার মান নিয়ে জান নিয়ে টানাটানি। গ্রামের মেয়েরা তাই এই নদীকে নিয়ে খেলা করতে ভয় পায়। তাদের হাটে পৌঁছে দেয় বুড়ো মাঝি। কয়েক দিন মাঝির দেখা নেই, শরীর ভালো নেই বুঝি। তার জায়গায় খেয়া বাইছে যে, তার হাতের বৈঠা বাঁশির মতো বাজে, নদীর জলে তান ওঠে। এক দিন সে নৌকায় সবার ঠাঁই হল, শুধু হল না রাধার। পুরুষটি বলে, ‘ভয় নেই, পরের খেয়ায় তোমায় নিয়ে যাব।’ নদীতীরে দাঁড়িয়ে থাকে মেয়ে। বড়াই চুপটি করে নৌকায় গিয়ে বসে। মেয়েটি ভাবে, বড়াই তো থেকে যেতে পারত তার কাছে। বড়াই কি এ মাঝিকে চেনে? নৌকা এগোয়, বড়াইয়ের চোখ রাধাকে দেখে। বড়াইয়ের সে চোখে কী যেন আছে। সংশয়, ভয়, আনন্দ— রাধা ঠিক বুঝতে পারে না। বড়াইয়ের ঢুকে যাওয়া চোখের যে কোনও ভাষা থাকতে পারে, রাধা কোনও দিন সে কথা ভাবেনি। আজ এই একা নদীর ধারে দাঁড়িয়ে মনে হল তার, বড়াইয়ের চোখেও বুঝি কেউ বাসনার কাজল মাখিয়ে দিয়েছে।
আইহনের সঙ্গে এমনিতে বড় একটা দেখা হয় না রাধার। দিনের বেলা আইহন নানা কাজে নিজেকে ব্যস্ত রাখে। রাতে তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে পড়া তার স্বভাব, নইলে রাধার শরীরের কাছে জবাবদিহি করতে হবে। সে বড় শক্ত কাজ। যে বরফ গলতে পারে না, গলতে চায় না, সে আগুনকে খুব ভয় পায়। তবু কখনও কখনও তো বরফেরও সাধ হয় জল হয়ে আগুনকে নেভানোর। আইহন অনেক ক্ষণ অপেক্ষা করছিল তার কুটিরের দ্বারে। রাধা আর বড়াইয়ের অনেক আগেই ঘরে ফেরার কথা। রাধাকে নিয়ে নানা কথা আইহনের কানে আসে। রাখাল ছেলেটির সঙ্গে রাধা বনে বনে ঘোরে। তাদের নাচ-গানের অপরূপ মগ্নদৃশ্য দেখে ফেলেছে কেউ।
রাধা ভাবতেও পারেনি, আইহন কুটিরদ্বারে এ ভাবে তার জন্য অপেক্ষা করবে। তার চুলে বুনো ফুল, অঙ্গের বস্ত্র বিধ্বস্ত, গলার মালাটি যে কৃষ্ণের সঙ্গে খেলতে খেলতে কখন পড়ে গেছে। কী আর করবে সে? সে দিন দ্বিতীয় বার সেই মাঝি যখন খেয়া দিচ্ছিল, তখনই তো সব ওলট-পালট হয়ে গেল। মাঝনদীতে বৈঠা গেল থেমে। জল হয়ে উঠল উত্তাল। নৌকা গেল ডুবে। যে জলে খেলতে ভয় পেত গ্রামের মেয়েরা, সেই জলের ছোঁয়া গায়ে লাগতেই রাধার সমস্ত শরীর কেমন অবশ হয়ে গেল। তখনই সেই মাঝি হয়ে উঠল রসিক বাঁশিওয়ালা। জলের মধ্যে যে এমন করে কেউ কাউকে বাজিয়ে তুলতে পারে, রাধা তা ভাবতেও পারে না। মনের মতো শরীরেরও যে নিজস্ব দাবি থাকে, আইহনের কাছে থাকতে থাকতে রাধা ভুলেই গিয়েছিল। বাঁশিওয়ালা সে আগল দিল খুলে। তার পর দিন নেই রাত নেই, রাধা বাজতেই লাগল। সে খেলার কত ছল, কত ছলনা। এক দিন বাঁশিওয়ালা ছত্রধর সেজে এল। ঠা ঠা রোদে মেয়েরা চলেছে হাটে। ছত্রধর ছাতা ধরতে চায়। রাধা বললে, ‘ধরো।’ ছত্রধর ধরলে। তবে যে আশায় ধরলে, সে আশা তার পূর্ণ হল না। নৌকা থেকে জলে ফেলে ফেলে রাধাকে যে বাজিয়েছিল, সেই বাজনদার পুরুষকে মাথায় ছাতা ধরিয়ে রাধা পথ হাঁটাল, কিন্তু পথে এক বারও স্পর্শ দিল না।
এই ছোঁয়া-ছুঁয়ি খেলতে খেলতে রাধা আইহনকে একেবারেই ভুলে গিয়েছিল। আজ মুখোমুখি হতেই থমকে গেল। কী বলত কে জানে? বাঁচিয়ে দিল বড়াই। ‘গরুগুলো আজকাল কেমনধারা হয়ে উঠেছে নাতি। তোমার বউকে ফেলে দিল মাঠে। ভাগ্যিস একটু-আধটুর ওপর দিয়ে গেছে।’ আইহন কিছু বলে না। কঠিন হয়ে ওঠে তার চোখ মুখ। তার পর দীর্ঘশ্বাসে নরম হয়ে যায়।
মেয়েটি বুঝতে পারছে না রাখাল ছেলেটির মতিগতি। ছোঁয়াছুঁয়ির দিনগুলি চোখের পলক ফেলার আগেই উধাও হয়ে গেল। আজকাল বাঁশিওয়ালা কোথায় যে থাকে! দেখাই পাওয়া যায় না। বড়াইকে দিয়ে এক দিন ডাক পাঠিয়েছিল, আসতে বলেছিল বনের ভেতরের বনে। তা পুরুষ বলে সে নাকি আসবে না সেখানে, তার নাকি ধ্যানভঙ্গ হচ্ছে, এখন নাকি বড় কাজ করার সময়। রাধার শরীরে আগুন লেগে যায়। মনে হয় কেটে ফেলে হাত-পা। যখন সে আবিষ্কার করেনি খেলাধুলো, তখন এক রকম। কিন্তু এখন? যে তাকে এমন করে রাঙিয়ে দিল, সে যদি বলে আর রং দেব না, কেমন লাগে! রাধা ভাবে, উড়ন্ত পাখির মতো সে গিয়ে পড়বে রাখালের কাছে। বাইরে বসন্তের হাওয়া আর রাধার দু’চোখে বর্ষার ধারা। এক বার, এক বার যদি সে তাকে পেত বনের ভেতরে!
মেয়েটি ঘুমিয়ে পড়েছে। কৃষ্ণ তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিল। তার পর আস্তে আস্তে নিজের কোল থেকে নামিয়ে রাখল ঝরা পাতার নরম শয্যায়। এ পাতার ওপর আর নতুন করে আলোর রেখা এসে পড়বে না আজ। বিকেল শেষে সন্ধে হতে চলল। বড় গভীর মিলন হয়েছে তাদের আজ। এতটা এমন করে আগে কখনও হয়নি। মিলনতৃপ্ত রাধা কৃষ্ণের কোলে মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়েছিল। ঘুমন্ত সেই মেয়েটিকে নিবিড় ভাবে দেখে কৃষ্ণ। দেখে দেখে আশ মেটে না তার। তার পর সে ঘুমন্ত মেয়েটির মুখ থেকে দৃষ্টি তুলে নেয়। এ বনে বাইরের শব্দ খুব একটা প্রবেশ করে না। শব্দহীন মুহূর্তগুলিকে তাই বড় দীর্ঘ লাগে। এই নীরবতা অসহনীয় বলে মনে হয়। এই মুহূর্তের অবসান চায় সে। খেয়াল করে, একটু দূরে বড়াই এসে দাঁড়িয়েছে। রাধার ঘুম ভাঙলে তাকে বাড়ি নিয়ে যাওয়ার দায়িত্ব তার। ছেলেটি নরম স্বরে বলল বড়াইকে, ‘রাধাকে দেখো। আমার যাওয়ার সময় হল। এই গ্রাম, বন, নদী ডিঙিয়ে যেতে হবে অনেক বড় কাজে। সে কাজের ডাক এসেছে।’
বড়াই কিছু বলে না, চুপ করে থাকে। ছেলেটি শ্যামবর্ণ, রাধা শুভ্রা। বড়াইয়ের মাঝে মাঝে তাদের লগ্ন অবস্থায় ভুল করে দেখে ফেললে মনে হত, মেঘের ওপর বুঝি বিদ্যুৎ খেলা করছে। আজ বিদ্যুৎকে রেখে মেঘের যাওয়ার সময় হল। অন্য কোনও জায়গায় জল দেবে সেই মেঘ, সে জল লাগবে বড় কোনও কাজে। বড়াই নিজের ভেতরে দেখে, এমনই তো হয়, রাধা তা জানে না।
রাধার মুখের দিকে তাকিয়ে টনটন করে ওঠে বড়াইয়ের মন। আসলে যে কোনও রংই লাগে ও মুছে যায়। কোনও রংই কি চির কাল থাকে? রং থাকে না, রঙের স্মৃতি থেকে যায়।
বড়াইয়ের ভেতরে যে রঙের স্মৃতি আছে, তার ঢুকে যাওয়া চোখের ভেতরে যে আর একটা চোখ আছে, সে কথা রাধা এখনই বুঝতে পারবে না, কোনও দিন পারবে। কৃষ্ণের চলে যাওয়ার শব্দে ঝরা পাতার শব্দ, বড়াই চুপটি করে এসে রাধার কাছে বসে। রাধার ঘুম ভাঙানোর সময় হল।

 

সুত্র- আনন্দবাজার