মায়া কামরুলের বিরুদ্ধে যে কোন সময় ব্যবস্থা : মন্ত্রিত্ব ছাড়াও হারাতে পারেন দলীয় পদ-পদবীও

kamrul Maya যে কোন ব্যবস্থা নেয়া হতে পারে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের দুই প্রভাবশালী মন্ত্রী মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া ও অ্যাডভোকেট কামরুল ইসলামের বিরুদ্ধে। দুর্নীতির অভিযোগে সাজা পাওয়া ও পচা গম আমদানি করে সরকারের ইমেজ নষ্ট করায় দলের সভানেত্রী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা শিগগিরই এ ব্যবস্থা নিচ্ছেন বলে খবর চাউর হয়েছে।
মন্ত্রিসভা থেকে বরখাস্ত করা ছাড়াও দলীয় পদ-পদবিও তাদের কেটে নেয়া হতে পারে।
ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনামন্ত্রী মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়ার দুর্নীতি মামলায় ১৩ বছরের সাজা বহাল থাকায় তার মন্ত্রিত্ব ও সংসদ সদস্যপদ নিয়ে শোরগোল ও সমালোচনা না থামতেই নগরের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও খাদ্যমন্ত্রী কামরুল ইসলামের পচা গম কেলেঙ্কারি নিয়ে বিব্রতকর পরিস্থিতির মুখে পড়েছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। ব্রাজিল থেকে আমদানি করা পচা গম নিয়ে গত কয়েক দিন ধরেই রাজনৈতিক অঙ্গনে ‘দুর্গন্ধ ছড়াতে’ শুরু করেছে। অভিযুক্ত দুই মন্ত্রীর অবিলম্বে পদত্যাগ দাবি করেছে বিএনপিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল। নৈতিক অবস্থানের কারণে তাদের পদত্যাগ দাবি করেছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশসহ (টিআইবি) সুশীলসমাজের প্রতিনিধিরা।
আওয়ামী লীগের নির্ভরযোগ্য একাধিক সূত্র জানায়, উল্লিখিত দুই মন্ত্রীর নানা কর্মকাণ্ড নিয়ে দল ও সরকারের ভেতরে-বাইরে চরম ক্ষোভ বিরাজ করছে। তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার দাবি উঠছে দলের বিভিন্ন ফোরামে। প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা ওই দুই নেতার আমলনামা ব্যাপকভাবে বিশ্লেষণ করছেন। দল ও সরকারের ইমেজ নষ্ট করার অভিযোগে আগামী ঈদের আগে বা পরে যেকোনো সময় তাদের বিরুদ্ধে বড় ধরনের সিদ্ধান্তের ঘোষণা দিতে পারেন তিনি।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, দুর্নীতির একটি মামলায় সাজা থাকায় ত্রাণমন্ত্রী মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়ার মন্ত্রিত্ব নিয়ে সাংবিধানিক জটিলতার সৃষ্টি হয়েছে। মায়া ২০০৮ সালে জ্ঞাত আয়ের বাইরে অবৈধভাবে ৬ কোটির টাকার বেশি সম্পদ অর্জনের মামলায় ১৩ বছরের কারাদণ্ডে দণ্ডিত হন। ২০১০ সালের অক্টোবরে হাইকোর্টের একটি বেঞ্চ শুধু আইনি প্রশ্নে ওই রায় বাতিল করেন। দুদক এর বিরুদ্ধে আপিল করলে গত ১৪ জুন সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ হাইকোর্টের ওই রায় বাতিল করে হাইকোর্টে আপিলের পুনঃশুনানির নির্দেশ দেন। ফলে মায়ার বিরুদ্ধে ঢাকার বিশেষ আদালতে দেয়া ১৩ বছরের সাজা বহাল রয়েছে। আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশ সংবিধানের ৬৬ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী ১৪ জুন থেকে মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়ার মন্ত্রিত্ব ও সংসদ সদস্য পদ খারিজ হয়ে গেছে। তাই মায়ার মন্ত্রিত্ব ও সংসদ সদস্যপদে বহাল থাকা নিয়ে তুমুল বিতর্ক চলছে।
এর আগে গত বছর নারায়ণগঞ্জে চাঞ্চল্যকর সাত খুনের ঘটনায় জামাতা র‌্যাবের কর্মকর্তা লে. কর্নেল তারেক সাঈদ মোহাম্মদের জড়িত থাকার ঘটনায় মায়া ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়েন। ওই সময় জামাতাকে রক্ষায় মন্ত্রী মায়ার দেন-দরবার সরকারের উচ্চমহলকে ক্ষুব্ধ করে। এর আগে আওয়ামী লীগের ’৯৬ সালের শাসনামলে মায়ার ছেলে দীপু চৌধুরীর নানা অপকর্মে বারবার বিতর্কের মুখে পড়েন মায়া। ফলে তাকে মন্ত্রিত্ব থেকে বাদ দিতে দলের ভেতরে-বাইরে ব্যাপক চাপের মুখে রয়েছে আওয়ামী লীগ।
অন্য দিকে ব্রাজিল থেকে চার শ’ কোটি টাকার পচা গম আমদানি করে বেশ চাপের মুখে পড়েছেন খাদ্যমন্ত্রী অ্যাডভোকেট কামরুল ইসলাম। দল ও সরকারে ‘অতিকথনকারী’ হিসেবে পরিচিত এ মন্ত্রীর কর্মকাণ্ডের বিবরণ এখন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার টেবিলে। প্রধানমন্ত্রী নিজেও পচা গম সম্পর্কে পুলিশসহ বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছ থেকে স্যাম্পলসহ অভিযোগ পেয়ে খাদ্যসচিব মুশফেকা ইকফাৎকে তিরস্কার করেছেন। নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটদের মাধ্যমে ব্রাজিল থেকে আমদানিকৃত গমের নমুনা সংগ্রহ করার নির্দেশ দিয়েছেন।
জানা গেছে, এসব গম কেনায় কোটি কোটি টাকার দুর্নীতি হয়েছে। এত কিছুর পরও গম কেলেঙ্কারির পক্ষে বারবার সাফাই গেয়ে চলায় বিষয়টি আদালত পর্যন্ত গড়িয়েছে। গণমাধ্যমগুলোতেও খাদ্যমন্ত্রীকে ‘পচা কামরুল’ আখ্যা দিয়ে ব্যাপক সমালোচনা চলছে। তবে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের কাছে খবর আছে ব্রাজিলের পর ফ্রান্স থেকেও পচা গম কিনছেন অ্যাডভোকেট কামরুল। খাদ্যমন্ত্রীর এসব কর্মকাণ্ড গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়।
২০০৯ সালে ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক কামরুল ইসলাম এমপি নির্বাচিত হয়েই প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পান। দ্বিতীয় মেয়াদে পদোন্নতি পেয়ে খাদ্য মন্ত্রণালয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পান তিনি। কিন্তু শুরু থেকেই গম কেনা, নিয়োগ ও বদলিসহ নানা পদক্ষেপে তার বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠতে শুরু করে। গেল দেড় বছরে খাদ্য অধিদফতরের মহাপরিচালক পদ থেকে তিন অতিরিক্ত সচিবকে বদলি করিয়েছেন। তার সাথে বনিবনা না হওয়ার কারণেই তাদের সরিয়ে দিয়েছেন এমন অভিযোগ করছেন কেউ কেউ।
এ ছাড়া সম্প্রতি অনুষ্ঠিত সিটি করপোরেশন নির্বাচনে সরকারের এ দুই মন্ত্রী আওয়ামী লীগ সমর্থিত দুই মেয়রপ্রার্থীর সরাসরি বিরোধিতা করেন। এ কারণেও তাদের ওপর অসন্তুষ্ট খোদ প্রধানমন্ত্রী ও দল। তাদেরকে দলীয় প্রার্থীর পক্ষে কাজ করাতে বেশ বেগ পেতে হয় আওয়ামী লীগ নীতিনির্ধারকদের। সে জন্য প্রধানমন্ত্রী তাদের ওপর চরম ক্ষুব্ধ। এ কারণে শিগরিই নগরের সাধারণ সম্পাদক ও যুগ্মসাধারণ সম্পাদক পদ ছাড়তে হতে পারে তাদের।
আওয়ামী লীগের নির্ভরযোগ্য একাধিক সূত্রে জানা গেছে, শিগগিরই সরকার ও দলে শুদ্ধি অভিযান শুরু হবে। এতে বিতর্কিতরা মন্ত্রিসভা থেকে বাদ পড়তে যাচ্ছেন। এ ছাড়া মহানগর আওয়ামী লীগের সামনের কমিটিতেও বিতর্কিতরা বাদ পড়বেন। ঈদুল ফিতরের আগে বা পরে যেকোনো সময় এমন সিদ্ধান্ত আসতে পারে। এ ক্ষেত্রে মায়ার বিষয়টি অনেকটাই আদালতের ওপর নির্ভর করায় কামরুলের মন্ত্রিত্ব যে থাকছে না সে ব্যাপারে অনেকটাই নিশ্চিত সূত্রগুলো।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে আওয়ামী লীগের একজন শীর্ষ নেতা বলেন, কারো বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে সাথে সাথে তো আর ব্যবস্থা নেয়া যায় না। একটু অপেক্ষা করেন। এদের সবার বিরুদ্ধে ধীরে ধীরে ব্যবস্থা নেয়া হবে।
অন্য এক কেন্দ্রীয় নেতা বলেন, অ্যাডভোকেট কামরুল ইসলামকে নিয়ে দল বিপাকে এতে কোনো সন্দেহ নেই। কয়েক দিন ধরে কামরুল আর মায়াকে নিয়ে যেভাবে লেখালেখি হচ্ছে তাতে দল বিব্রত না হয়ে পারে না। আমরা নেত্রীর দিকে তাকিয়ে আছি।
তার মতে, শাসক দল হিসেবে এখন আওয়ামী লীগ কামরুল-মায়াকে নিয়ে যতটা চাপে আছে গত বিএনপির আন্দোলনের সময়ও এতটা চাপ অনুভব করেনি।
দলের সম্পাদকমণ্ডলীর একজন সদস্য বলেন, পচা গম নিয়ে কামরুল যেভাবে মিডিয়ায় কথা বলে যাচ্ছেন তাতে তো আর পচা গম ভালো হয়ে যাবে না। কামরুল সাহেব বরাবরই বেশি কথা বলেন। বেশি কথা বলে তিনিই যে শুধু খেসারত দিচ্ছেন তা নয়, দলও তার খেসারত দিচ্ছে। আসলে অপাত্রে কন্যা দান করলে যা হয়। তার চেয়ে অনেক ত্যাগী ও যোগ্য নেতারা মন্ত্রিসভার বাইরে ঘুরছেন। আর মন্ত্রিত্বের সুবাদে তিনি দিব্যি সব কিছু দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন। তবে সব কিছুরই তো শেষ আছে। কামরুলের দিনও হয়তো শেষ হয়ে এসেছে। দল ও সরকারের ইমেজ নষ্ট করায় তাকে নেত্রী কোনোভাবেই ছাড়বেন না।
আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর একজন সদস্য আলাপকালে বলেন, অনেক ত্যাগ ও শ্রমের বিনিময়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশকে স্বাভাবিক অবস্থায় নিয়ে এসেছেন। সরকারের ইমেজ রক্ষায় নিরলসভাবে তিনি কাজ করে যাচ্ছেন। কিন্তু দলের কোনো কোনো নেতা-নেত্রীর কারণে যদি সেই ইমেজে ভাটা পড়ে তবে তাদেরকে ঝেড়ে ফেলতে তিনি একটুও দ্বিধা করবেন না। তিনি সঠিক সময়ে অবশ্যই সঠিক সিদ্ধান্ত নেবেন।
মহানগর কমিটির দেখভালের দায়িত্বে থাকা আওয়ামী লীগের কৃষিবিষয়ক সম্পাদক ও সাবেক খাদ্যমন্ত্রী ড. আবদুর রাজ্জাক বলেন, গণমাধ্যমে যেভাবে বিষয়টি আসছে তাতে দেশের বিবেকবান মানুষ বিব্রত এবং আমরাও কিছুটা বিব্রত বোধ করছি। তবে অভিযোগ পরীক্ষা করে দেখা হচ্ছে।