বান্দরবানে ম্যালেরিয়ার প্রাদুর্ভাব ছড়িয়ে পড়ছে

bandorbon

পার্বত্যাঞ্চল এখনো রয়ে গেছে ম্যালেরিয়ার মৃত্যুকূপ হিসেবেই। কেবল স্থানীয়রাই নয়, বাইরে থেকে যাওয়া পর্যটক বা কর্মসূত্রে পার্বত্যাঞ্চল ভ্রমণকারীরাও এর ভয়ানক পরিণতির শিকার হচ্ছে। সর্বশেষ গত বুধবার রাতে একাত্তর টেলিভিশনের কেন্দ্রীয় অফিসের ক্যামেরা পারসন আলী হোসেন রিপন মারা যান সেরিব্রাল ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হয়ে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালের আইসিইউতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়। মাত্র কয়েক দিন আগে রিপন একটি সংবাদ সংগ্রহের কাজে ঘুরে আসেন বান্দরবানের দুর্গম থানচিসহ সংশ্লিষ্ট আরো কিছু এলাকা। এর পরই তিনি জ্বরে আক্রান্ত হন। চিকিৎসকরা জানান, মূলত বান্দরবান থেকেই তিনি ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হন। সময়মতো তা শনাক্ত ও উপযুক্ত চিকিৎসা না হওয়ায় তাঁর এমন পরিণতি হয়। স্থানীয় সূত্র জানায়, এবার বান্দরবানের থানচি উপজেলার দুর্গম এলাকায় ম্যালেরিয়ার প্রাদুর্ভাব ছড়িয়ে পড়েছে। ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হয়ে দুই শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এ ছাড়া এ রোগে আক্রান্ত হয়েছে বিভিন্ন বয়সের শতাধিক মানুষ। দুর্গম রেমাক্রি ইউনিয়নের ছোট মদকপাড়া, গ্রুপিংপাড়া, অংহ্লা খুমিপাড়া, মালিরাম চেয়ারম্যানপাড়া, পেনেদং পাড়া, অংসু খুমিপাড়া, রেমাক্রি বাজার এলাকা, তিন্দু ও থানচি এলাকার অধিকাংশ পাড়ায় ম্যালেরিয়ার প্রকোপ বেশি দেখা দিয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্র জানায়, দেশে বর্তমানে ১৩টি জেলার প্রায় এক কোটি ৩২ লাখ ৫০ হাজার মানুষ ম্যালেরিয়ার ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। এর ৯৮ শতাংশই রয়েছে পার্বত্য চার জেলা ঘিরে। ২০১৪ সালে ওই এলাকায় ম্যালেরিয়ায় মারা যায় ৪৫ জন, ২০১৫ সালে তা কমে ৯ জনে নেমে আসে। একই সঙ্গে কমে আসে ম্যালেরিয়ায় আক্রান্তের হারও। ২০১৪ সালে আক্রান্ত ছিল ৫৭ হাজার ৪৮০ জন, ২০১৫ সালে তা কমে ৩৯ হাজার ৭১৯ জনে নেমে আসে। আবার চলতি বছরে এ পর্যন্ত মারা গেছে পাঁচজন। এর মধ্যে চলতি মাসেই কেবল বান্দরবানে ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হয়ে মারা গেছে তিনজন। আগামী জুলাই-আগস্ট মাস আরো ঝুঁকিপূর্ণ। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশকে ম্যালেরিয়ামুক্ত করতে বাংলাদেশ, ভারত ও মিয়ানমারের মধ্যে সীমান্ত ইস্যুতে সমন্বিত জরুরি উদ্যোগ জরুরি। নইলে ২০২০ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে ম্যালেরিয়ামুক্ত করার লক্ষ্য চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক আবুল কালাম আজাদ বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে মশার দেহবৈশিষ্ট্যও পরিবর্তন হচ্ছে। তাই ম্যালেরিয়ার ঝুঁকি একেবারে কমছে না। এ জন্য সরকারের তরফ থেকে যে কার্যক্রম চলছে এর পাশাপাশি মানুষের মধ্যেও সচেতনতা বাড়ানো প্রয়োজন। বিশেষ করে নিজেকে সুরক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় সাধারণ সতর্কতা অবলম্বন করা যায়। আর আক্রান্ত হলে দ্রুত চিকিৎসাকর্মীদের শরণাপন্ন হতে হবে। ম্যালেরিয়া কর্মসূচির ডিপিএম ডা. এম এম আক্তারুজ্জামান বলেন, ‘পার্বত্য অঞ্চলে ম্যালেরিয়া নিয়ন্ত্রণে ব্যাপক কার্যক্রম চলছে। সবচেয়ে বেশি জোর দেওয়া হচ্ছে এলাকাবাসীর মধ্যে কীটনাশকযুক্ত মশারি ব্যবহার বাড়ানো ও উপসর্গ দেখা দেওয়া মাত্র স্থানীয় স্বাস্থ্যকেন্দ্রে গিয়ে চিকিৎসা নেওয়ার ওপর। কারণ পার্বত্য সব এলাকায়ই আমরা সব স্বাস্থ্যকর্মীকে প্রশিক্ষণ দিয়েছি। এ ছাড়া তাঁদের কাছে তাৎক্ষণিক পরীক্ষার উপাদানও দেওয়া আছে। এমনকি প্রাথমিক ওষুধও আছে।’ বিশেষজ্ঞরা বলেন, ম্যালেরিয়ার পেছনে রয়েছে ‘প্লাজমোডিয়াম’ নামের এক পরজীবী। ম্যালেরিয়া আক্রান্ত লোকের রক্ত স্ত্রী অ্যানোফিলিস মশা শুষে নিয়ে যখন অন্য লোককে কামড়ায়, তখন ওই পরজীবী স্থানান্তরিত হয়ে সুস্থ মানুষের দেহে ম্যালেরিয়ার সংক্রমণ ঘটায়। আর ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হওয়ার উপসর্গ হচ্ছে জ্বর, কাঁপুনি, ঘাম হওয়া, মাথাব্যথা, শরীর ব্যথা, বমি বমি ভাব এবং বমি হওয়া। কোন ধরনের পরজীবী আক্রমণ করেছে এবং কত দিন ধরে ওই ব্যক্তি রোগে ভুগছে, তার ওপর নির্ভর করে এই উপসর্গগুলো কখনো কখনো ৪৮ থেকে ৭২ ঘণ্টায় দেখা দিতে পারে। তবে এখন এই রোগের চিকিৎসা খুবই সহজ। ডিপিএম ডা. এম এম আক্তারুজ্জামান বলেন, ‘আমরা বান্দরবানের ওপর এবার বেশি নজর দিয়েছি। পাশাপাশি বাইরে থেকে যেসব পর্যটক পার্বত্য যেকোনো এলাকায় যাবেন তাদের ক্ষেত্রে বিশেষ সতর্কতা অবলম্বনের জন্য বলা হচ্ছে। বিশেষ করে ওই এলাকায় অবস্থানকালে অবশ্যই মশারির মধ্যে ঘুমানো এবং সার্বক্ষণিক সম্ভব হলে ফুলহাতা ড্রেস পরা ভালো। সেই সঙ্গে বাজারে থাকা যথাযথ কর্তৃপক্ষের নিবন্ধনকৃত বিশেষ ক্রিম বা লোশন ব্যবহার করা যায়।’