বাংলাদেশ সরকারের উচিত গণমাধ্যম স্বাধীনতা আর নিরাপত্তার একটি পরিবেশ গড়ে তোলাঃ এফপি

 

বাংলাদেশে উগ্রপন্থিদের সন্ত্রাসী হামলা আর গণমাধ্যমের স্বাধীনতার ওপর সরকারের অভিযান স্তব্ধ করে দিতে পারে রাজনৈতিক উদারমনাদের কণ্ঠ। আর এমন পরিস্থিতি হবে জঙ্গিগোষ্ঠীদের জন্য সহায়ক। সরকারের উচিত গণমাধ্যম স্বাধীনতা আর নিরাপত্তার একটি পরিবেশ গড়ে তোলা। আর আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উচিত এজন্য বাংলাদেশ সরকারকে চাপ দেয়া। যুক্তরাষ্ট্রের ফরেন পলিসি ম্যাগাজিনের এক প্রতিবেদনে গতকাল এসব কথা বলা হয়েছে। ‘টু কাউন্টার আইএস ইন বাংলাদেশ, লুক টু দ্য ব্লগার্স’ শীর্ষক ওই প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, প্যারিস ও সিনাইয়ে সাম্প্রতিক হামলার ঘটনায় বিশ্বজুড়ে আইএসের সন্ত্রাসী তৎপরতা চালানোর সক্ষমতা নিয়ে মনোযোগ আকর্ষিত হয়েছে। বাংলাদেশে বিদেশি নাগরিকদের ওপর হামলার দায় স্বীকার করেছে আইএস। এর মধ্যে রয়েছে এক ইতালিয়ান যাজক ও এক ইতালিয়ান ত্রাণকর্মীর ওপর হামলা। এছাড়া একটি শিয়া মসজিদে বন্দুক হামলার ঘটনা ঘটেছে। এসব হামলায় প্যারিস বা সিনাই হামলার মতো সূক্ষ্ম পরিকল্পনার মাত্রা না থাকলেও বাংলাদেশে এ জঙ্গিগোষ্ঠীর প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে। আইএসের অনলাইন ম্যাগাজিন দাবিকের এক নিবন্ধে ‘বেঙ্গলে’ জিহাদের পুনরুত্থানের প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছে। দাবি করা হয়েছে বাংলাদেশে নিয়োগ করা হয়েছে একজন আঞ্চলিক নেতাকে। তবে, বাংলাদেশে আইএসের প্রভাব নিয়ে যারা উদ্বিগ্ন তাদের আইএস বাদেও অন্যান্য সন্ত্রাসী হামলার দিকে মনোযোগ দিতে হবে। এগুলো হলো- ধর্মনিরপেক্ষ, উদারমনা বাংলাদেশি কণ্ঠের ওপর হামলা। ২০১৫ সালে ৪ জন বাংলাদেশি ব্লগার সন্ত্রাসী হামলায় নিহত হয়। এসব হামলার পাশাপাশি ব্লগার ও গণমাধ্যম স্বাধীনতার ওপর সরকারের অভিযান দেশের রাজনৈতিক উদারমনাদের কণ্ঠ স্তব্ধ করে দিতে পারে। আর এমন একটি পরিস্থিতি হবে আইএসের জন্য সহায়ক। আইএস সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার করে সমর্থন ও রিক্রুট করার জন্য সুপরিচিত। উদারমনা স্থানীয় কণ্ঠগুলো উগ্রপন্থার বিপরীত বক্তব্য প্রচার করার ক্ষেত্রে কার্যকর। ব্লগার ও অন্যান্য কণ্ঠ যারা কট্টর উগ্রপন্থি বক্তব্যের বিপরীত ভাষ্য উপস্থাপন করতে পারে তাদের ওপর হামলা আইএসের মতো জঙ্গিগোষ্ঠীগুলোকে রিক্রুট করার উর্বর ক্ষেত্র সৃষ্টিতে সহায়ক হতে পারে। এদের ক্রমবর্ধমান প্রভাব প্রতিহত করতে নীতিনির্ধারকদের উচিত গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও নিরাপত্তার একটি পরিবেশ গড়ে তোলা। ধর্মনিরপেক্ষ ব্লগার ও তাদের সহযোগীদের বিরুদ্ধে সাম্প্রতিক সিরিজ হামলা শুরু হয় ২০১৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে। সুপরিচিত ব্লগার অভিজিত রায়কে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। এরপর একইভাবে হত্যার শিকার হন ওয়াশিকুর রহমান, অনন্ত বিজয় দাস ও নিলয় নিল। ৩১শে অক্টোবর কয়েকটি প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান হামলার শিকার হয় যারা অতীতে ধর্মনিরপেক্ষ বক্তব্য প্রকাশ করেছে। অজ্ঞাত কট্টরপন্থিরা ৮৪ জন ব্লগারের একটি ‘হিট লিস্ট’ প্রচার করেছে। এতে করে এ সম্প্রদায়ের মধ্যে আতঙ্ক আরও বৃদ্ধি পেয়েছে। এদিকে, বাংলাদেশে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপর সহিংসতা দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে মেরুকরণ সৃষ্টি করেছে। চাপ সৃষ্টি করেছে ধর্মনিরপেক্ষ এবং আন্তঃধর্র্মীয় বিশ্বাস নিয়ে কথা বলা মানুষদের ওপর। হামলার শিকার হয়েছে হিন্দুদের একটি মন্দির, শিয়া সম্প্রদায়ের মসজিদ। এছাড়া খ্রিষ্টান যাজকদের বিরুদ্ধে হুঁশিয়ারি পাঠানো হয়েছে। এর ফলে রাজনৈতিক মেরুকরণ আরও বৃদ্ধি পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব পিস অ্যান্ড সিকিউরিটি স্টাডিজের প্রেসিডেন্ট এএনএম মুনীরুজ্জামান বলেছেন, শিয়া সম্প্রদায়ের ওপর হামলা এবং খ্রিষ্টানদের ওপর হুমকি হলো বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িক, ধর্মীয় বিভক্তি সৃষ্টির প্রচেষ্টার প্রমাণ। ব্লগার ও ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপর ক্রমবর্ধমান সহিংসতা ইতিমধ্যে রাজনৈতিক বিতর্কে উদারমনা কণ্ঠগুলোর অংশগ্রহণকে সীমিত করেছে। দুর্ভাগ্যজনকভাবে, ব্লগার ও উদারমনা কণ্ঠগুলোর বিরুদ্ধে ক্রমবর্ধমান সহিংসতা মোকাবিলায় সরকার নেয়া পদক্ষেপগুলো ছিল অসঙ্গতিপূর্ণ। কিছু ব্লগারের জন্য তারা নিরাপত্তা বাড়িয়েছে। স্থানীয় কিছু সন্ত্রাসী গোষ্ঠীকে নিষিদ্ধ করেছে। এমনকি কয়েকজনকে গ্রেপ্তারও করেছে। তবে ২০১৩ সালে সরকার ধর্ম অবমাননা আইনের অধীনে চারজন ব্লগারকে গ্রেপ্তার করে। এর মধ্যে একজন আগে কট্টরপন্থিদের হামলার শিকার হয়েছিল। গত কয়েক মাসজুড়ে সোশ্যাল মিডিয়া প্লাটফর্মের ওপর সরকারের অভিযান গণমাধ্যম সেন্সরশিপের ব্যাপকতর একটি ধারা নিয়ে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। সরকার সম্প্রতি ‘জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে’ প্রায় এক মাস ধরে কয়েকটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম সাইট নিষিদ্ধ করেছিল। যে দেশে ফেসবুকের মতো ওয়েবসাইটগুলো তথ্যের গুরুত্বপূর্ণ সূত্র হিসেবে দেখা হয়, সেখানে এমন নিষেধাজ্ঞা ‘সেন্সরশিপের উদ্বেগজনক রীতির অংশ’ যা গণমাধ্যম স্বাধীনতাকে সীমিত করে। বাংলাদেশের একটি ইংরেজি দৈনিক নিউ এজ সম্পাদক নূরুল কবীর সম্প্রতি বলেছেন, যারা সরকারের কর্মকাণ্ড নিয়ে সমালোচনা করে বা সরকারের রাজনৈতিক, আদর্শিক অবস্থান প্রত্যাখ্যান করে তাদের ওপর চাপ সৃষ্টি করা শুরু করেছে বর্তমান সরকার। ব্লগারদের ওপর হামলার বিরুদ্ধে সাম্প্রতিক প্রতিবাদ ছিল এসব উদারমনা ব্যক্তিদের দৃঢ়চিত্তের ইতিবাচক লক্ষণ। কিন্তু এদের রক্ষা করতে সরকারকে অবশ্যই আরও বেশি কিছু করতে হবে। উদারমনা রাজনৈতিক কণ্ঠের ওপর চড়াও না হয়ে তাদের জন্য পরিবেশ সৃষ্টি ও তা রক্ষার্থে কাজ করতে হবে। বাংলাদেশ সরকারের উচিত গণমাধ্যম স্বাধীনতা সীমিত করা আইনগুলো সংস্কার করা। ১৯৭৪ সালের ‘বিশেষ ক্ষমতা আইন’ (স্পেশাল পাওয়ার্স অ্যাক্ট) সাংবাদিকদের বিনা বিচারে সর্বোচ্চ ১২০ দিন আটক রাখার সুযোগ দেয় সরকারকে। সরকারের নীতি নিয়ে সমালোচনামূলক সাংবাদিকদের টার্গেট করতে এ আইন ব্যবহার করা হয়েছে। ২০১৩ সালের আইসিটি আইন বিশেষভাবে সমস্যাপূর্ণ। নাস্তিক ব্লগারদের গ্রেপ্তারে এ আইন ব্যবহার করেছে সরকার। সরকার সম্প্রতি ‘ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্ট ২০১৬’ শীর্ষক নতুন একটি আইনের প্রস্তাব করেছে। সরকারের দাবি এটা সাইবার অপরাধ নিয়ন্ত্রণের জন্য। তারপরও প্রস্তাবিত এ আইন আরও উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে যে এটা ব্যবহার করে সাংবাদিকদের টার্গেট করা হতে পারে। আরও সীমিত করা হতে পারে মত প্রকাশের স্বাধীনতা। বিশেষ ক্ষমতা আইন আর আইসিটি আইন- উভয় আইনই বাতিল বা উল্লেখযোগ্য সংস্কার করা প্রয়োজন। গণমাধ্যম আইন সংস্কার ও সোশ্যাল মিডিয়া সেন্সরশিপ থেকে লাগাম টেনে ধরতে সরকারকে অনুপ্রাণিত করার ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক চাপ হবে গুরুত্বপূর্ণ। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় যদি বাংলাদেশে আইএসের প্রসার নিয়ে উদ্বিগ্ন হয় তাহলে তাদের উচিত মুক্ত গণমাধ্যমের জন্য নিরাপদ পরিবেশ দেয়ার জন্য সরকারকে চাপ দেয়া। এছাড়া, ‘হিট লিস্টে’ থাকা সকল ব্লগারের নিরাপত্তা বৃদ্ধিসহ ব্লগার, প্রকাশক ও গণমাধ্যমের উদারমনা কণ্ঠগুলোর ওপর মাঝে মধ্যে চড়াও হওয়ার চর্চা বন্ধে সরকারকে আহ্বান জানানো উচিত। এসব হামলা আর গ্রেপ্তার নীরব করে দেয়ার প্রভাব সৃষ্টি  করছে। উগ্রপন্থি কণ্ঠগুলোর কাছে ক্ষেত্র ছেড়ে দিতে বাধ্য হচ্ছে উদিয়মানরা।