এবারের ঈদকে আমরা বরণ করেছি সংগ্রামী ঈদ হিসেবে

 

“সংগ্রামী বাংলা” নামে একটি মুক্তিযুদ্ধকালীন পত্রিকা, তাদের ঈদ সংখ্যায় সম্পাদকীয়তে লিখেছিল ‘এবারের ঈদকে আমারা বরণ করেছি ঈদ মোবারক হিসেবে নয় বরং সংগ্রামী ঈদ হিসেবে নিয়েছি’ । বাংলার বুকে ঈদগাহে আজ মানুষ নেই, কারন পশুর (পাকিস্তানীদের)  সাথে মানুষ এক সাথে নামাজ পড়তে পারিনা । মুক্তিযুদ্ধের খবর জনগণের কাছে পৌছানোর লক্ষ্যে এডভোকেট সিরাজুল ইসলাম, এমপির উপদেশ ও পৃষ্ঠপোষকতায় এ পত্রিকাটি প্রকাশিত হয় । সম্পাদক ছিলেন মোহাম্মদ ইমদাদুল হক। সংগ্রামী বাংলা প্রেস তেঁতুলিয়া হতে এমদাদুল হক কর্তৃক প্রকাশিত ও প্রচারিত । পত্রিকার বিনিময় মূল্য ১০ পয়সা, পৃষ্ঠা সংখ্যা ২ এবং কলাম সংখ্যা ছিল চার, ছাপা ঝকঝকে ছিল । প্রথম প্রকাশ ও শেষ সংখ্যা কবে প্রকাশিত হয় তা জানা যায়নি ।

সেই মুক্তিযুদ্ধের এত বছর পর আমরা আর একটি যুদ্ধের মুখোমুখি হয়েছি , আর তা হল করোনা যুদ্ধ । যা সারা বিশ্বব্যাপী সর্বগ্রাসী হয়ে এসেছে । যেই যুদ্ধে কোন অগ্নি অস্ত্র নেই, কামান নেই, পারমানবিক বোমার মত বিধ্বংসী মরণাস্ত্র নেই । তারপরেও ভয়, কিসের যে ভয় তা চোখেও দেখা যায়না । এ এমন এক ভয় যা মানুষের কাছে মানুষই অস্ত্র । যার কারণে আজও আমরা সেই যুদ্ধকালীন সময়ের মত ঈদ্গাহে নামাজ পড়তে পারছিনা ।

মায়ের কাছে শুনেছি ৭১ এর ২০ শে রমজানে আমার নানা এবং মামা’দের পাক বাহিনীদের দোসর বিহারীরা ডেকে নিয়ে হত্যা করে । এরপর তাদের সেই ঈদ যে কেমন ভয়াবহ ছিল তা হয়তো অনুমান করা কঠিন। কিন্তু আমার মায়ের সেই বাবা আর ভাই ছাড়া ঈদ কি আর ঈদ হয়েছে ?

এই সময়টাতেও যাদের পিতা মাতা বা আত্নীয় স্বজন করোনায় মারা গেছে তাদেরও কি ঈদ হবে ? আমি সে সময়টা না দেখলেও এখনকার সময়ের সাথে তা মিল খুজতে চেষ্টা করেছি। এবং মনে হচ্ছে কোথাও একটা মিল হয়তো আছে ।

৭১ এর সেই দিন দিনগুলোতেও যারা শহীদ হয়েছেন তাদের লাশ তো তাদের পরিবার পরিজনেরা কেউ দেখেনি । করোনাতেও মারা গেলে কেউ হয়তো দেখছে আবার কেউ হয়তো দেখছেনা, এর জন্য আলাদা ব্যবস্থা করা হয়েছে । তবে করোনায় মারা যাওয়াদের কপালে কবর জুটেছে কিন্তু ৭১ এর অনেক শহীদের কপালে তাও জুটেনি । কি অদ্ভুত মিল তাই না ?

ইতিহাস বলে সেই মুক্তিযুদ্ধের সময়ের ঈদে লক্ষ লক্ষ পরিবারের ঈদে নতুন কাপড় জুটেনি। তখন তাদের কাছে ঈদের চাঁদ রাতের চাঁদ ছিল রক্তমত্ত ঈদের চাঁদ । তাদের ঈদও এসেছিল কিন্তু আসেনি ঈদের আনন্দ ।

এবারের করোনার ঈদও সেদিনের থেকে তেমন বেশি আলাদা নয়। সেদিনের মত আজও ঈদ এসেছে কিন্তু আনন্দ আসেনি । এখানে আমার নিজেরও কিছুটা আক্ষেপ আছে । কারন আমার প্রথম সন্তানের এবার জীবনের প্রথম ঈদ। তাকে আমি আমার সামর্থ থাকা সত্ত্বেও একটি নতুন জামা কিনে দিতে পারিনি সব বন্ধ থাকার কারণে। সেক্ষেত্রে আমার কাছে এই অর্থ অনেকটাই মূল্যহীন মনে হয়েছে । যেমন শুনেছি যুদ্ধকালীন সময়েও ছিল ।

এটি যে শুধু আমার ক্ষেত্রে হয়েছে এমন নয়, আমার মত কত পিতার যে এখন হৃদয়ে রক্তক্ষরণ হচ্ছে কে জানে । অনেক স্বামী তাদের নতুন স্ত্রীদের কিছু দিতে পারেনি এমনকি মা-বাবাকেও কিছু দিতে পারেনি । আবার কত পরিবারে হয়তো চালও নেই । তবে সরকারী ব্যবস্থাপনা এবং কিছু মানুষের সাহায্যের কারণে এখনো ক্ষুদার কষ্ট কম। কিছুটা কষ্টে আছে হয়তো মধ্যবিত্ত পরিবার গুলো ।

এত কিছুর পরেও স্বাধীনতা আমাদের কাছে ধরা দিয়েছিল । এর জন্যে হারাতে হয়েছে ৩০ লক্ষ তাজা প্রাণ । করোনাতেও আমরা হারিয়েছি এখন পর্যন্ত ৪৮০ টি জীবন এবং মোট আক্রান্ত হয়েছে ৩৩ হাজার ৬১০ জন । সামনে কার কপালে যে কি আছে তা এখনো অনিশ্চিত ।

সেই বিজয়ের মত আমাদের আবারও মুক্তি মিলবে । আমরা আবারও মুক্ত হব ,আবার স্বাধীন হব সেই আশাতেই আছি । তবে এর জন্য আমাদের আরও কিছুদিন ধৈর্য ধরতে হবে । মানতে হবে সাস্থ্যবিধি ঠিক যেমনটি ৭১ এর মুক্তিযুদ্ধারা এবং বাংলার মুক্তিকামী জনতা ধৈর্য ধরেছিল । মুক্তি আমাদের একদিন আসবেই ইনশাআল্লাহ ।

ওই যে ভোর হয়ে গেছে । আজ তারপরেও ঈদের সকাল । সবাইকে ঈদের শুভেচ্ছা জানিয়ে শেষ করছি, ঈদ মোবারক ।

লেখক- মুহাম্মদ সাইফুল ইসলাম।

সম্পাদক- কর্ণফুলী নিউজ

২৫ মে, ২০২০ইং

 

তথ্য সূত্র- গণমাধ্যমে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ/ সংগ্রামের নোটবুক/৭১ এর রমজান।

 

Karnaphuli News